যাদের জন্য রোযা না রাখার অনুমতি আছে

রোযা হচ্ছে ইসলামের অকাট্য ফরয বিধান। ধনী-গরীব নির্বিশেষে আকেল-বালেগ নারী-পুরুষ সকলের জন্য বাধ্যতামূলক। তবে কয়েক শ্রেণীর লোকের জন্য রোযা না রাখার অনুমতি আছে-

ক. মুসাফির
যিনি নিজের অবস্থান থেকে শরয়ী ৪৮ মাইল বা তার অধিক দূরত্বে গমনের উদ্দেশ্যে বের হয় এবং গন্তব্যস্থানে পনের দিন বা তার অধিক সময় অবস্থানের নিয়ত না করে, এমন ব্যক্তিকে পুনরায় নিজের আবাসস্থলে ফিরে আসা পর্যন্ত মুসাফির বলা হয়।

  • শরীয়ত মুসাফিরের জন্য সফর অবস্থায় রোযা না রাখার অনুমতি দিয়েছে। তবে সফরে অস্বাভাবিক কষ্ট না হলে রোযা রাখা উত্তম। অন্যথায় অনুত্তম। সর্বাবস্থায় মুসাফির রোযা না রাখলে পরবর্তীতে তা অবশ্যই কাযা করতে হবে, কাফফারার প্রয়োজন নেই।
    হযরত আনাস রা.কে সফর অবস্থায় রোযা রাখার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন- “যে রোযা রাখবে না সে অবকাশের সুযোগ গ্রহণ করলো। আর যে সফরে রোযা রাখলো সে উত্তম পন্থাই গ্রহণ করলো। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা: ৬/১৩২, হা-৯০৬৭)
  • সফরাবস্থায় রোযা রাখা শুরু করলে নফল নামাযের ন্যায় তার উপর তা পূরণ করা ওয়াজিব। তাই শুরু করে ভেঙ্গে ফেলা বৈধ নয়। ভেঙ্গে ফেললে গুনাহগার হবে। তাতে কাযা ওয়াজিব হবে, কাফফারা দিতে হবে না। হযরত আনাস রা. বলেন- কেউ রোযা রেখে সফরে বের হলে রোযা ভাঙ্গতে পারবে না। তবে যদি পিপাসার কারণে জীবননাশের আশঙ্কা দেখা দেয়, তাহলে রোযা ভাঙতে পারবে। অবশ্য পরে তা কাযা করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার শামী: ২/৪৩১)
    মুকীম অবস্থায় রোযা রেখে সফর আরম্ভ করলেও তা পূর্ণ করতে হবে। যেমনি হযরত আনাস রা. এর উপরোক্ত বক্তব্যে ফুটে উঠেছে।
  • কোনো মুসাফির রোযা না রেখে রমযানে দিনের শেষাংশে আপনাবস্থানে ফিরে আসলে বা মুকিম হয়ে গেলে অথবা কোনো মহিলা দিনের শেষাংশে হায়েয নিফাস থেকে পবিত্র হয়ে গেলে রমযানের মর্যাদা রক্ষার্থে অবশিষ্ট সময় পানাহার থেকে বিরত থাকা জরুরী। তবে এর দ্বারা ওই দিনের রোযা আদায় হবে না; বরং অন্যান্য দিনের মত এ দিনেরও কাযা ওয়াজিব। হযরত ইব্রাহীম নাখয়ী রহ. বলেন, মুসাফির রমযানের দিনের বেলায় খানা খেয়ে পরে মুকিম হয়ে গেলে দিনের বাকি অংশ পানাহার থেকে বিরত থাকবে। (ফতোয়ায়ে তাতারখানীয়া: ৩/৪২৮)
    হযরত হাসান রহ. বলেন- সুবহে সাদিকের পর যে হায়েয থেকে পবিত্র হলো,সে দিনের বাকি অংশে পানাহার করবে না। (তাতারখানীয়া: ৩/৪২৮)

খ. গর্ভধারিণী
গর্ভবতীকে নিজের বা সন্তানের একান্ত প্রয়োজনে রোযা না রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছে। আর মুসলিম অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতে যদি গর্ভধারিণী রোযা রাখলে তার বা সন্তানের প্রাণহানী অথবা অঙ্গহানী হওয়ার প্রবল আশঙ্কা কিংবা শরীর স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে, তাহলে এমন গর্ভবতীর জন্য রোযা না রাখার অনুমতি আছে। পরবর্তীতে অবশ্যই কাযা করতে হবে। (আদ্দুররুল মুখতার: ২/৪২২)

গঠ. দুগ্ধবতী
রোযা রাখার কারণে সন্তানের মৃত্যু বা অঙ্গহানী কিংবা মারাত্মক স্বাস্থ্যহানীর প্রবল আশঙ্কা দেখা দিলে রোযা না রাখার অনুমতি রয়েছে। বিশেষ করে যদি সন্তান বাইরের খাবার গ্রহণ না করে বরং মায়ের দুধের উপরই একান্ত নির্ভরশীল হয়। অন্যদিকে যদি রোযা রাখলে সন্তান দুধ না পায়, এক্ষেত্রে রোযা না রাখার অনুমতি রয়েছে। তবে পরবর্তীতে অবশ্যই এ রোযা কাযা করে নিতে হবে।
তিরমিযী শরীফে আছে- আল্লাহ তা‘আলা মুসাফিরের জন্য রোযার বিধান শিথিল করেছেন এবং নামাযও আংশিক কমিয়ে দিয়েছেন। আর গর্ভবতী ও দুগ্ধবতীর জন্যও রোযার হুকুম শিথিল করা হয়েছে। (তিরমিযী: ১/১৫২, হা-৭১৫ দারুল হাদীস)

ঘ. অসুস্থ ব্যক্তি
যে অসুস্থ ব্যক্তি রোযা রাখলে তার রোগ বৃদ্ধি পায় এবং জীবন চলা কষ্টকর হয় অথবা রোগ বৃদ্ধি না হলেও রোযার কারণে রোগ দীর্ঘ হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে এমন রোগীর জন্য রোযা না রাখার অনুমতি আছে। তবে এ ব্যাপারে বিজ্ঞ মুসলিম ডাক্তারের মতামত এবং বিজ্ঞ মুফতির নিকট থেকে ফতোয়া নিয়েই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। (আদ্দুররুল মুখতার: ২/৪২২)

ঙ. অতি দুর্বল ও বৃদ্ধ ব্যক্তি
যেসব লোক বার্ধক্যজনিত কারণে রোযা রাখতে পারে না। আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে রোযা রাখার আবশ্যকীয়তা রহিত করেছেন। রোযা না রেখে প্রত্যেক রোযার পরিবর্তে ফিদিয়া প্রদান করার বিধান দিয়েছেন। কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-
وَعَلَى الَّذِينَ يُطِيقُونَهُ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍ….الخ. (البقرة: ১৮৪)
অর্থাৎ আর যাদের রোযা রাখা অত্যন্ত কষ্টকর, তারা ফিদিয়া তথা একজন মিসকিনকে খাবার প্রদান করবে। (বাকারা: ১৮৪)

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *